স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদ্রোহী ভাষা বাংলা

0

বাংলা ভাষা তার জন্ম লগ্ন থেকেই বিদ্রোহী। তার জন্ম প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে। এই স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদ্রোহী ভাষা দীর্ঘ জীবন কালের সূচনা থেকে বর্তমান পর্যন্ত অনেক অত্যাচার, উৎপীড়ন সহ্য করেও মাথা নত করেনি কোন স্ববিরোধী অপশক্তির কাছে।

অন্য সকল ভাষার মতো বাংলা ভাষারও জন্ম হয়েছে। ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে ছোট থেকে বড়তে। সাথে তার ব্যবহারকারীদের মন এমনভাবে জয় করে নিয়েছে এই বিদ্রোহী ভাষাটি যা অন্য কোন ভাষা পারেনি। তাই বাংলাকে ভাষার রাণী বলা যায়।

ভাষার রাণী ‘বাংলা’ তার জীবনের শুরুতেই প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে এবং শাসক শ্রেণীর নিষ্ঠুর অব্যাখোয়ে অত্যাচার সহ্য করে তার বরদাস্তের পরিচয় দিয়েছে।

কিন্তু বাংলা ভাষার সবচেয়ে কঠিন সময়টা আসে মূলত উনিশ শতকের দিকে। যার জন্য দিতে হয়েছে বুকের তাজা রক্ত।

সময়টা ১৯৪৭। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক মাস পূর্বে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা যখন প্রায় পাকাপোক্ত। তখন মুসলিম লীগের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের অনেকে বলতে থাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু। তখনি সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবীরা তাদের লেখায় বাংলা ভাষার পক্ষে সচেতনতা এবং তথ্য ও যুক্তি তুলে ধরেন।

মাতৃভাষার পরিবর্তে অন্য কোনো ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে বরণ করার চাইতে বড় দাসত্ব আর কিছু থাকিতে পারে না।

– সাপ্তাহিক মিল্লাত পত্রিকা ( ২৭ জুন ১৯৪৭)

জাতি ও ধর্মকে অযৌক্তিক ভাবে ভেঙে শত চেষ্টার পর পরিশেষে অর্জিত পাকিস্তানকে ঘিরে বাঙালি মুসলমানরা তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির যে স্বপ্ন দেখেছিল তাতে ভাঙন ধরে। তাও আবার পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে। যার কারণ অবাঙালি প্রধান শাসকদের ক্ষমতা চিরতরে ধরে রাখার বাসনা এবং ব্যাপক বৈষম্য।

পাকিস্তানিরা মূলত চেষ্টা করতে থাকে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব, সংস্কৃতি, মানসিকতা, শুরু থেকে নিয়ন্ত্রণ করে চিরতরে বাঙালি জাতিকে পশ্চিম পাকিস্তানের গোলাম করে রাখার জন্য। যা তারা পরিকল্পনার সাথে করতে চেয়েছিল।

তখনকার এনভেলাপ, পোস্ট কার্ড, মনি অর্ডার ফরম,ডাক টিকিট উর্দু এবং ইংরেজী ভাষায় লিখা ছিল। তার চেয়েও বেশি ছিল বাঙালি স্বার্থের অদূরদর্শিতা ও একদেশদর্শীতা ।

ভাষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বৈষম্য ছাত্র শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সরকারী কর্মকর্তাদের প্রতিবাদী করে তুলে।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ইংরেজী ও উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে পরিষদে ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে গ্রহণের জন্য সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। যা প্রত্যাখ্যানে ভাষা দবিতে আগুন জ্বেলেছিল।

ভাষা অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রথম জমায়েত, সভা, মিছিল হয় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে। অর্থাৎ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ৩ মাসের মধ্যেই। যার স্লোগান ছিল।’ সব কিছুতে বাংলা চাই’ , ‘উর্দুর সঙ্গে বিরোধ নাই’, ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’, ‘উর্দু বাংলা ভাই ভাই’। এর মধ্যে দিয়ে তাদের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ করে। যার পিছনে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল না।

তৎকালিন পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে (২৭ নভেম্বর ১৯৪৭) পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা উর্দুর পক্ষে গৃহিত হওয়ার সুপারিশ হয়। যার পরিপেক্ষিতে ক্ষুব্ধ ছাত্র ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র সভার ডাক দেয়।

সেই সভা বিশাল ছাত্র মিছিলে রূপ নিয়ে সচিবালয়,মন্ত্রী ভবন এবং মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ‘বর্ধমান হাউস’ এর সামনে বিক্ষোভে সমবেত হয়। যা স্লোগান ছিল।

“রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, উর্দুর জুলুম চলবে না”

এভাবে ধীরে ধীরে ছাত্রসমাজ সুসংগঠিত হতে থাকে উর্দুর বিরুদ্ধে। ছাত্ররা বুঝতে পেরেছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলে বাঙালি ছাত্ররা পিছিয়ে পড়বে। যেমন ছিল ভারত বিভাগের পূর্বে।

সাতচল্লিশের নভেম্বর -ডিসেম্বরে দিকে যে বিক্ষোভ হয়েছিল তাতে যথেষ্ট শক্তি না থাকলেও আটচল্লিশের ১১ মার্চ বিক্ষোভ থেকে আন্দোলনে রূপ নেয়, ভাষা আন্দোলন।

তখন সরকার মত বিরোধি আন্দোলন মোঠেও সহজ ছিল না। আন্দোলনকে সফল করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধারার রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক নেতা কর্মীদের সাথে আলোচনা চলে । এই প্রথম বারের মত বাঙালিরা জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে একত্রিত হতে থাকে মাতৃভাষাকে রক্ষার জন্য। যাতে প্রধান ভূমিকা ছিল রাজনীতি সচেতন ছাত্রদের।

আন্দোলনে পুলিশের লাঠির মুখে অনেক নেতা কর্মী আহত ও গ্রেপ্তার হয়, তবো থেমে থাকেনি ভাষা আন্দোলন। আরো শক্তি নিয়ে চলতে থাকে আপন গতিতে। সেই আন্দোলন ঢাকা শহরের বাইরে ও ছড়িয়ে সফল ভাবে পালিত হয়।

ব্যাপক আন্দোলনের মুখে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রদের শান্তি চুক্তির প্রস্তাব দেন। কিন্তু ছাত্ররা বুঝে ফেলে যে এটি কেবল আন্দোলন ভাঙার পায়তারা। ছাত্ররা আন্দোলন স্থগিত করতে চায় নি। যা পরবর্তীতে আরেকটি সফল আন্দোলনে রূপ দিতে চারবছর অর্থাৎ বায়ান্নর ফেব্রুয়ারি পযন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকা সফরে আসেন। রেসকোর্সের জন সমুদ্রের সম্মুখে তিনি উর্দুতেই বলেন – ভাষার ক্ষেত্রে যে প্রশ্ন উঠেছে তাতে উর্দু, কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা।

ভাষণ শোনে ক্ষিপ্ত ছাত্ররা সাথে সাথেই নো নো বলে প্রতিবাদ জানায় এবং মর্মাহত হয়ে তোরণ ভেঙে ফেলে।

কিন্তু অনেক ইতিহাসবিদের মতে, সে দিন রেসকোর্স ময়দানে কোন প্রতিবাদ লক্ষ হয়নি।

১৯৪৮ সালের আন্দোলন ভাঙার পর ১৯৪৯, ১৯৫০ পুলিশের দাপটে হালকা আন্দোলন দিবস ছাড়া বেশি কিছু সম্ভব হয় নি।

তবে ভাষা আন্দোলনের জন্য ১৯৫১ সালটি একটি সাথে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। কারন এসময়েই রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবি, স্বদেশে সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনের দাবি, ছাত্র যুব সমাজ এ দাবির পক্ষে সমর্থনও ব্যাপক হতে থাকে।

ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি সময় ছিল গুরুত্বপূর্ণ কেননা সে সময়ে আন্দোলন শক্তি অর্জন করেছে, সংগঠিত হয়েছে।

১৯৫১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সরকারী কর্মচারীদের অনেকে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে এগিয়ে এসে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন।

প্রধান মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকা সফরে এসে ২৭ জানুয়ারি ১৯৫২ সালে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জন সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে তিনি আবারো বলে – পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হইবে উর্দু। যা জিন্নার ভাষায় পূণরায় তিনি উচ্চারণ করলেন। এর পরদিন থেকেই শুরু হয় তুমুল আন্দোলন।

এবং ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসভায় ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কর্মসূচির মধ্যেছিল দেশব্যাপী হরতাল, সভা, শোভাযাত্রা এবং ঢাকায় অ্যাসেম্বলি (আইন পরিরিষদ) ঘেরাও।

৪ ফেব্রুয়ারি সভা শেষে ১০-১২ হাজার ছাত্রছাত্রীর বিশাল মিছিল রাজপথ ঘুরে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান তোলে :’ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ‘, আরবি হরফে বাংলা লেখা চলবে না’, ‘ভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্র চলবে না’।

এর পরবর্তী সময়ে ২১ তারিখের আন্দোলন সফল করার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। ভাষার মত একটি সার্বজনীন বিষয়কে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন হয়। ১১ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের প্রয়োজনে অর্থ সংগ্রহের জন্য পতাকা দিবস পালন করা হয়।

ভাষা আন্দোলনের সময়টা মোঠেও অনুকূল ছিল না বাঙালিদের। চরম দুর্দশার মধ্যেও মাথা নত করেনি কারো কাছে বীর বাঙালি জাতি।

বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ আইনসভার প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু। সে কথা মাথায় রেখেই একুশে ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সংঘটিত তৎপরতার চরিত্র লক্ষ করে অবাঙালি প্রধান প্রশাসক কর্তৃপক্ষ হয়ত কিছুটা ভীত হয়ে বাঙালির আন্দোলন ব্যর্থ করতে ২০ তারিখ ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠন এবং নেতারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে ছিল না। অন্যদিকে ছাত্র নেতারা যে কোন মূল্যে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কর্মসূচি পালনে ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। একই মনোভাব ছিল যুবলীগ এবং ছাত্রনেতৃত্বের বাম অংশের।

পরবর্তীতে ১১-৩ ভোটে ছাত্রনেতারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। অলিখিত সিদ্ধান্তে পরদিন অর্থাৎ একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ আমতলায় হাজির হওয়ার। যার লক্ষ ছিল রাষ্ট্র ভাষা বাংলার পক্ষে প্রস্তাব নিতে এমএলএদের বাধ্য করা।

সচেতন ছাত্রসমাজ বুঝতে পেরেছিল সরকার আরোপিত এই ১৪৪ ধারা বাধার শিকল ভাঙতে না পারলে ভাষার দাবি ও আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়বে।

একুশ ফেব্রুয়ারি সকালে আমতলার সভা শেষে সরকারি বাধা নিষেধ ভেঙে বেরিয়ে আসার পর ছাত্রছাত্রীদের মনে পেছন ফিরে তাকানোর মতো চিন্তা ঠাঁই পায়নি। যা ছিল মূলত তরুণ নিরস্ত্র ছাত্র জনতা শান্তিপূর্ণ লাড়াই। তাদের সাথে বেলা বাড়ার সাথে সাথে যোগ দেয় নানা শ্রেণীর লোকজন।

সমবেত ছাত্র জনতা চেষ্টা করে হোস্টেল সংলগ্ন পরিষদ ভবনের সামনে রাস্তায় পৌছানোর। কিন্তু লাঠি চার্জ কাঁদানে গ্যাসের আক্রমণে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

তখনো ছাত্র জনতার বহু উচ্চারিত স্লোগান —

‘ রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’, ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’।

তখন নিরপরাধ ছাত্রদের বুক রঞ্জিত করে গুলি ছুড়ে পুলিশ যেখানে পুলিশের নিরাপত্তার কোন হুমকি বিন্দু মাত্র ছিল না। যা এখনো বাঙালি জাতি ও বিশ্ব ইতিহাসে ট্র্যাজেডি হয়ে রয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে শিক্ষিত সমাজ অবিরত ব্যবহার করে চলেছে বাংলা-ইংরেজির সংযোগে দুষ্ট মিশ্রভাষা। বর্তমানে টিভি টকশো, রেড়িও আরজে, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, লেখক সকলে ব্যবহার করছে এই মিশ্রভাষা । রাস্তা ঘাটে বিলবোর্ডে এখনো ব্যবহার হচ্ছে ইংরেজী ভাষা। তাহলে এটা কি প্রমাণ করে না আমরা আমাদের ভাষা আন্দোলনের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নই। আমরা কী এখনো স্বাধীন হয়েও পরাধীন?

তথ্য – ভাষা আন্দোলন
আহমদ রফিক

আবুল হাসনাত
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়