সংবাদ সূচনা কীভাবে লিখবেন?

বিশেষ প্রতিনিধি

0

 

সংবাদের শুরুতে পুরো সংবাদটির পরচিতি মূলক যে প্যারা থাকে তাই সংবাদ সূচনা (লিড বা ইন্ট্রো)। খুব সহজ করে বললে, একজন মানুষের নাম যদি শিরোনাম হয়, সে কেমন, কি কাজ করে তার পরিচিতি মূলক কিছু বাক্য লিখলে তা হবে সূচনা।

অর্থাৎ সূচনা হলো ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ, যা পাঠককে রিপোর্টটি পড়তে আগ্রহী করে তুলে ঘটনার ভেতরে টেনে নেয়।

একটি মার্জিত, সংক্ষিপ্ত, আকর্ষণীয় – সূচনা পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে। অবশ্য কখনও কখনও প্রথম দুই প্যারা নিয়েও সংবাদ সূচনা হতে পারে সাধারণত ১৯ থেকে ২৫ শব্দের সূচনাকে
স্ট্যান্ডার্ড বলা যায়। দীর্ঘ সূচনা পাঠকের মনোযোগ নষ্ট করেতে পারে। সূচনা লেখার সময় খেয়াল রাখতে হবে- সূচনাটি যাতে অনেক বড় না হয়ে যায় এবং কয়েকটি শব্দ বারবার চলে না আসে। সংক্ষিপ্ত ও আকর্ষণীয় সূচনা পাঠকের দৃষ্টি সহজেই আকর্ষণ করতে পারে।

বর্তমানে ব্যস্ত পাঠকদের সামনে সাংবাদিককে যত দ্রুত সম্ভব একটি ঘটনার সারাংশ উপস্থাপন করতে হয় কারণ কর্মব্যস্ত পাঠক প্রথমে কোনো ঘটনার মূল বিষয়টি জানতে চান। আর এজন্যই সূচনা লেখার সঠিক ও জনপ্রিয় পদ্ধতি ‘উল্টো পিরামিড কাঠামো’র আবির্ভাব এবং বেশির ভাগ প্রতিবেদনে এ কাঠামো মেনেই সূচনা অথবা পুরো প্রতিবেদন লেখা হয়।

বেশিরভাগ পাঠকই সাধারণত সম্পূর্ণ সংবাদ ধৈর্য নিয়ে খুঁটিয়ে খুটিয়ে পড়েন না। তারা চায় খুব কম সময়ে শিরোনাম, সূচনা পড়ে তাদের দিনের কৌতূহল মেটাতে এবং এই চোখ বুলানোর সময় পাঠকের যে সংবাদ দরকার বোধ হয়, তিনি সেই খবরের পুরোটা পড়েন।

কাজেই সংবাদ সূচনা এমন হতে হবে যাতে: পাঠকের সংবাদসম্পর্কে প্রাথমিক কৌতূহল নিবৃত্ত হয় এবং মূল্যায়নে সাহায্য করে। খবরের গুরুত্ব বিবেচনার জন্য বার্তা সম্পাদকও সংবাদ সূচনার ওপর নির্ভর করে থাকেন।

তাই সংবাদ প্রতিবেদন বা রিপোর্টের সূচনা করার একটা ভাল কৌশল হচ্ছে:

‘যেমনভাবে বলা তেমনভাবে লেখা’।

থমসন ফাউন্ডেশনের সাংবাদিকতার শিক্ষকরা সংবাদ সূচনা লেখার সময় চারটি নিয়ম মনে রাখতে বলেছেন। যথা :

(১) সংবাদ সূচনাটি সম্পূর্ণ রিপোর্টটির উপযোগী হতে হবে।

(২) সংবাদ সূচনাটি পড়ে যেন পাঠক রিপোর্টের বাকি অংশটুকু পড়তে চান।

(৩) সংবাদ সূচনাটি সাধারণত সংক্ষিপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

(৪) সংবাদ সূচনা সচরাচর রিপোর্টের প্রধান বা মূল তথ্যকে ভিত্তি করে হবে। (এই নিয়মের প্রধান ব্যতিক্রম হচ্ছে বিলম্বিত ভাবারোহক ধরনের রিপোর্ট)।

উপরোক্ত নিয়মগুলোর প্রথমটির অর্থ হচ্ছে সংবাদ সূচনা রিপোর্টের বিষয়বস্তুর চরিত্রের সঙ্গে সুসামঞ্জস্য হবে। অর্থাৎ রিপোর্টের বিষয়বস্তু যদি গুরুগম্ভীর হয় তা হলে তার সূচনাতেও একই ভাব রক্ষা করতে হবে। হাল্কা সুর হবে না। সূচনাকে এক ধরনের ব্যাখ্যা, বডিতে তার ভিন্ন, কোন মিল নেই এমন হলে পাঠকরা সংবাদপত্রটির উপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে। তাই সংবাদ সূচনা অহেতুক চমকপ্রদ করা উচিত নয়।

দ্বিতীয় নিয়মটি হলো সংবাদ-সূচনা পড়ে পাঠক মনস্থির করেন বাকি সংবাদ টুকু পড়বেন কি না। অর্থাৎ সংবাদ-সূচনা পড়ে পাঠক সিদ্ধান্ত নেন যে রিপোর্টের বাকিটুকু পড়া তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় কিনা। চতুর্থ নিয়মটির প্রয়োজনীয়তা এই আলোকেই বিচার করা বা উপলব্ধি করা যেতে পারে।

তৃতীয় নিয়মটি অর্থাৎ ছোট আকার সহজ ভাবে সংবাদ-সূচনা লেখার উপদেশটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কম শব্দে, একি শব্দ বারবার না দিয়ে সূচনা শেষ করা ভালো।

সূচনা লেখার প্রথাগত একটি নিয়ম হলো সূচনায় ছয়টি মৌলিক প্রশ্নের (5W -1H) কী, কে, কোথায়, কেন, কখন এবং কীভাবে উত্তর সাজিয়ে নিতে হয়। এ প্রশ্নগুলোকে বাংলায় বলা হয় ‘ষড়-ক’। কোনো সংবাদের সূচনা লেখার সময় এ প্রশ্নগুলোর উত্তর সাজিয়ে উপস্থাপন করলেই একটি ভালো সূচনা লেখা যায়।

সারা বিশ্বে সংবাদপত্রগুলোয় সংবাদ সূচনা লেখায় কমবেশি ‘ষড়-ক’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এই ‘ষড়-ক’ হচ্ছে পাঠকের সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি; অর্থাৎ কী, কে, কখন, কোথায়, কেন ও কীভাবে- এ ছয়টি জিজ্ঞাসার সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েই সংক্ষেপে সংবাদটির মূল তথ্য পাঠককে সূচনার মধ্যে দিয়ে জানিয়ে দেয়া সম্ভব।

উপরোক্ত নিয়মগুলো আয়ত্ত করতে পারলেই সংবাদ সূচনা লেখা অনেকটা সহজ হয়ে যাবে। যত কম শব্দে পুরো ঘটনার সারমর্ম এক প্যারায় তুলে সূচনা লেখা যায় সে চেষ্টা করতে হবে আর সূচনার ভাষা এমন হতে হবে যাতে তা পুরো সংবাদটি পড়তে পাঠকদের আগ্রহী করে তোলে।

শাওলিন সুরভী
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়