করোনার নতুন ঢেউ, আমাদের কী করণীয়? সরকারেরই বা কী করণীয়?

মাহমুদুল হাসান সৌরভ

0

করোনা মহামারীতে সারাবিশ্ব আক্রান্ত, আক্রান্ত বাংলাদেশও। গেলো ৮ই মার্চ প্রথম সংক্রমণ এর এক বছর পূর্ণ করলো বাংলাদেশ। বলা যেতে পারে যে মিথ্যেই হোক বা সত্যি বাংলাদেশ নিয়ে যে পরিমাণ ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিলো বা যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে বড় বড় সংস্থাগুলো বলেছিলো তেমন কিছুই হয়নি অথবা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনুযায়ী বলা চলে দেশে এখনও অমন কোনো বিপদ এখনো ঘটেনি। তবে অনেক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, ছেড়ে দিয়েছেন নিজের বসবাসের স্থান। থমকে গিয়েছিলো স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এরপরেও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে যা কিনা নজির সৃষ্টি করেছে দক্ষিণ এশিয়ায়।

এতকিছুর মাঝেও দেশে করোনার নতুন ৩৪টি স্ট্রেইন পাওয়া গেছে যা কিনা পূর্বের ভাইরাসের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি সংক্রামক। এসব নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে খবর প্রকাশ হলেও দুঃখজনক সত্য এই যে এসে জনমনে ভয় সৃষ্টি করা তো দূরে থাক বরঞ্চ দেশের মানুষ আরো উৎসাহ নিয়ে সবকিছুকে অগ্রাহ্য করেই নিত্যদিনের কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন যা কিনা প্রথমদিকে করোনার ছড়িয়ে পড়া আটকাতে পারলেও এবার এমন চললে নাও পারতে পারে!

এমন অবস্থায় করোনার নতুন ঢেউ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১২ দফা সুপারিশ প্রণয়ন করেছে যেখানে বলা হয়েছে প্রয়োজন হলে সম্পূর্ণ লকডাউন সহ বিভিন্ন স্থানে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের জন্য বলা হয়েছে।

বর্তমানে সম্পূর্ণ লকডাউন দেয়া সম্ভব না হলেও কী করা যায় এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। সেক্ষেত্রে বলা চলে-

১. সরকার যদি লকডাউন না দিয়ে থাকেন তাহলে অন্ততপক্ষে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রসহ নানা জায়গায় জনসমাগম বন্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে এবং এই নিয়ন্ত্রণের সময় বাহিনীর সদস্যরাও যাতে নিরাপদ থাকেন সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

২. যদি লকডাউন দেয়া হয় এবং পরিপূর্ণভাবে দেয়া না যায় তবে যেসব জায়গায় লকডাউন দেয়া হবে সেসব স্থানের মানুষের চলাচল সহ সামগ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টি জোরদার করতে হবে।

৩. প্রতিটি অঞ্চলে সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণ চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৪. ভুলে গেলে চলবে না যে বর্তমানে দেশে করোনার টিকা দেয়া হচ্ছে, সেই টিকা প্রদানের কাজও সামগ্রিকভাবে নিয়ম মেনে চালাতে হবে।

৫. বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভা, সংবাদ সম্মেলনে সকলেরই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি জোরদার করতে হবে। কারণ দেখা যায় যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি কেউ মানছেন না, সরকার দলেরই হোক বা বিরোধী জোটের নেতাদের!

৬. গণমাধ্যমগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্যে সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জনসচেতনতা সৃষ্টিতে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতে হবে।

৭. যে স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে কেউ অস্বীকৃতি জানাবে বা স্বাস্থ্যবিধি মানবে না তাঁকে প্রয়োজনে অর্থদণ্ড বা কারাদণ্ডের সম্মুখীন করতে হবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত দ্বারা কাজ পরিচালনা করতে হবে।

৮. যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সার্বক্ষণিক জরুরী সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

৯. সম্মুখ যোদ্ধাদের নিরাপত্তা, তাঁদের আবাস, তাঁদের সব রকমের চাহিদার দিকেও নজর দিতে হবে।

১০. বাজার ঘাট, ধর্মীয় উপাসনালয়ে মানুষের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ অটুট রাখতে হবে।

১১. করোনা মহামারীর সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন অসাধু চক্রের কাজ, যেমন – বেশি দামে ওষুধ বিক্রি, ওষুধ মজুদ করে রাখা, বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে রোগী নিয়ে বাণিজ্য ইত্যাদি কঠোর হাতে দমন করতে হবে এবং কেউ যাতে এমন করতে না পারে সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।

১২. পাড়া মহল্লায়, গ্রামে সবখানে নিজ নিজ এলাকায় নিজের খেয়াল দিতে হবে। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করলে নিজের এলাকাতেও সরকারের সাহায্য ছাড়াই অনেক ভালো কাজ করা সম্ভব, দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ!

১৩. বিদেশ থেকে আগত মানুষদের ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে এবং তাঁদের কোভিড পরীক্ষার ছাড়পত্র দিতে হবে, প্রয়োজনে বিদেশ থেকে ফ্লাইট আসার ক্ষেত্রে কঠোর নির্দেশনা দিতে হবে।

সবচাইতে বড় কথা, নিজেকে আগে সচেতন হতে হবে। হতে হবে স্বাস্থ্য সচেতন। যে কোনো মহামারী বা দুর্যোগে মানুষের একাগ্রতা, একতা, সচেতনতা এবং মনের জোরই পারে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে। প্রয়োজন হলে কঠোর হওয়াটাও সময়েরই দাবী।

সবাই যে যার ঘরে থাকুক, নিরাপদে থাকুক। মহামারী বা অতিমারী থেকে একদিন আলোর মুখ দেখবেই বিশ্ববাসী এই কামনা।