দুঃস্বপ্ন? নাকি তিক্ত সমাজ?

0

পৃথিবীতে যদি অনিন্দ্যতম কোনো কাজ থেকে থাকে তবে তা হলো ভ্রমণ, কবিগুরু বলেছেন-

“মহাবিশ্বে-মহাকাল মাঝে
আমি মানব একাকি ভ্রমি বিস্ময়ে,
ভ্রমি বিস্ময়ে……”

বিস্ময়ে তো ভ্রমিতে চাই কিন্তু জগত তার সৃষ্ট নিয়ম শৃঙ্খলায় আষ্টেপৃষ্ঠে রাখে বিধায় সকলের এই মহাজগত ভ্রমণের সুযোগ হয় না। তাই আমি কল্পনাবিলাসী মানুষ কল্পনায় পুরো বিশ্ব ভ্রমণের চেষ্টা করি।

এক পড়ন্ত বিকেলে হাতে এক কাপ চা নিয়ে অলিন্দে ইজি চেয়ারে বসে কল্পনার রাজ্যে ঢুঁ মারার চেষ্টা করছিলাম, আজকের গন্তব্য নীলনদের দেশ মিশর।রানী ক্লিওপেট্রা, মিশরের সমস্ত ঐশ্বর্য যে মানবীর উপর ঠিকরে পড়েছিল তাকে একপলক দেখার জন্য নীলনদ পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় কোথ থেকে নীরা এসে হাজির!

-কিরে, এভাবে হাঁ করে ড্যাব ড্যাব করে কি দেখছিস?

– হরিণীর মতো তোমার ঐ দুচোখ!

নীরা আমার বাল্যকালের বন্ধু, খুব দুঃসাহসী, চঞ্চল এবং অভিমানী। তবে তার অভিমান হঠাৎই ধরা পড়ে। নীরার এমন আচরণের পেছনের উস্কানিদাতা হলো আমাদের সমাজের তাচ্ছিল্য।

স্বভাবতই নীরার মন খারাপ হলেই এখানে তার উদয় হয়, আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি তার মন ভালো করার।

-নীরা,তোর নামের উল্টো ফর্ম হলো রাণী আর তুই একটা চাকরানি! হা হা হা।

-একদম বাজে বকবি না বলে দিলাম!

-তোকে বাজে বকার মতো দুঃসাহস কি আমার আছে? তোকে নিয়ে স্বয়ং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একখানা কাব্যগ্রন্থ রচনা করে ফেলেছেন।

“নীরা,তুমি মন খারাপ করে আছো?
লক্ষ্মী মেয়ে, একবার চোখে চাও, আয়না দেখার মত দেখাও ও-মুখের মঞ্জরী
নবীন জলের মত কলহাস্যে একবার বলো দেখি ধাঁধার উত্তর”

-মেজাজ খারাপ করবি না একদম।

-উহু, এগুলো তোমার জন্য সুনীল দাদার লেখা। তিনি আরো বলেছেন-

“এক বছর ঘুমোবো না,
এক বছর স্বপ্নহীন জেগে বাহান্ন তীর্থের মতো তোমার ও শরীর ভ্রমণে পুণ্যবান হবো”

তোর শরীর কি আসলেই বাহান্ন তীর্থের মতো?

নীরা তেড়ে আসতেই সটকে পড়লাম।
নীরা হাসছে। হাসলে নীরাকে খুব সুন্দর দেখায়। অতি রূপবতীদের সবকিছুই সুন্দর। তবে সৃষ্টিকর্তা সবাইকে সবকিছু দেন না। নীরাকেও দেন নি।

-আচ্ছা পদ্ম, বিধাতা সবাইকে সমানভাবে সৃষ্টি করলেন না কেনো?

-এমন হলে পৃথিবীটা এতো সুন্দর হতো না।

-পৃথিবী কি আসলেই সুন্দর? তাহলে মানুষে মানুষে এতো ভেদাভেদ কেনো? সমাজে সবাইকে একই চোখে দেখা হয় না কেনো? বামন হয়েছি বলে কি সমাজ আমার মাথা কিনে নিয়েছে? সমাজে কি আমার কোনোই মূল্য নেই? রাস্তায় বেরোতে পারি না, সবাই তাচ্ছিল্যভরে তাকায়, কেউবা মুচকি হাসে! কখনো কোনো ফ্রেন্ড সার্কেল হয়ে উঠে নি আমার, সবাই ঠাট্টা তামাশা করে। আচ্ছা চাকরিতেও কি উচ্চতা লাগে? আমার কি কোনো আবেগ ভালোবাসা নেই? আমি কি আর দশটা মানুষের মতো না?

গড়গড়িয়ে কথাগুলো বলে চলল নীরা। আমি আমার ভাষ্য হারিয়ে ফেলেছি।

-আসলে পৃথিবীতে কিছু কিছু সুখী মানুষ জন্মগ্রহণ করে, তারা কাউকে ভালোবাসতে পারেনা। বিধাতা আমাকে এতো সুখ কেনো দিয়েছেন?

পদ্ম, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে! আমি এতো সুখ সহ্য করতে পারছিনা…এই তাচ্ছিল্যময় পৃথিবীকে আমার সুখগুলো দিয়ে যেতে চাই!

কিছু বুঝে উঠার আগেই নীরা ছাদের দিকে দৌড় দিলো! সে দৌড়াচ্ছে তো দৌড়াচ্ছে, আমি তার পিছু পিছু ছুটতে চেষ্টা করলাম! একি! আমার পা চলছেনা কেনো? মনে হচ্ছে কেউ কোনো ভারী পাথর দিয়ে আমার পা চেপে রেখেছে! আমি নড়তে পারছিনা, আমি সর্বশক্তি প্রয়োগ করলাম…না, পারছি না।

নীরা একেবারে কার্নিশে পৌঁছে গেলো! প্রকৃতি অতি মমতায় তাচ্ছিল্যতাকে গ্রহণ করে নিজেকে আরো মহিমান্বিত করতে যাচ্ছে। নাহ, নীরা,নাহ!!

আচমকা কাঁচ ভাঙার আওয়াজ! আমি ঘামছি আর ইজি চেয়ারে খুব দ্রুত দোল খাচ্ছি। নিচে চায়ের কাপখানা দু চার টুকরা হয়ে পড়ে আছে। স্বপ্নে বিভার ছিলাম এতক্ষণ…কল্পনার রাজ্য থেকে কখন স্বপ্নলোকে গমন করেছি বুঝেই উঠতে পারিনি!

আমার ঘোর এখনো কাটেনি। বুকের ভেতর কেমন যেনো একটা হাহাকার অনুভব করলাম। স্বপ্ন নামক এই রঙহীন ইন্দ্রিয় আমাদের মাঝে মাঝে আচ্ছন্ন করে রাখে। সমাজ যেমন নীরাদের বাঁচতে দেয় না সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও এই রঙহীন ইন্দ্রিয়কে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।

কি অদ্ভুত!!!

হঠাৎ নীরার ফোন!

 

কাজী তাসরিম ছাবেরী রিম

যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়