বিভীষিকাময় করোনা,অসহায়ত্ব ও সরকারি সিদ্ধান্তের বৈপরিত্য

মাহমুদুল হাসান সৌরভ

0

কোভিড ১৯, বর্তমান বিশ্বকে জেঁকে ধরা এক অভিশাপের নাম৷ লাখো মানুষের মৃত্যু, কোটি মানুষের আক্রান্ত হওয়া আবার সেরে ওঠা। বলা চলে এক বিভীষিকাময় পর্যায়ের মাঝ দিয়ে যাওয়া। মানুষ যে প্রকৃতির কাছে কতোটা অসহায় তার নজিরও বলা চলে।

বাংলাদেশে প্রথম কোভিডের নমুনা পাওয়া যায় ৮ই মার্চ ২০২০ সালে। এখন এপ্রিল ২০২১ চলছে, অর্থাৎ এক বছর অতিক্রান্ত করেছে বাংলাদেশ। এই সময়টাতে আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি এই যে বাংলাদেশে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি অবধি সংক্রমণ বা মৃত্যুর হার খুব একটা বেশি ছিলো না।

২০২০ সালে কোভিড মোকাবিলায় যে ন্যূনতম সাফল্য (অনেকের ভাষ্যে) সেটা এসছে সরকারের কঠোরতা, জনগণের ভীতি আর আইন শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কড়াকড়ির কারণে। কিন্তু ২০২১ এর শুরুতে জনতার যে তাচ্ছিল্যভাব, এদিক ওদিক ঘুরতে যাওয়া স্বাস্থ্যবিধি না মেনে, সরকারের উদাসীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অদক্ষতার এবং অদূরদর্শিতার পরিচয় সব মিলিয়ে আবার সংক্রমণ এবং মৃত্যুর রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবার চিত্র ভয়ানক রূপ নিচ্ছে।

গত কয়েকদিন ধরেই হয় আক্রান্তের সংখ্যা নাহয় মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বারবার স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা বলা হলেও কেউই মানছে না। এক্ষেত্রে সরকার ‘লকডাউন’ এর বিধিনিষেধ আরোপ করলেও মূলত সেই লকডাউন ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।

লকডাউন কী? সোজা কথায়, সবকিছু বন্ধ করে দেয়া বা স্থগিত রাখা। কিন্তু সবকিছু কী বন্ধ হয়েছে? হয়নি। সরকার যে লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সেটা দেখে জনতাই বলছে মূলত এটা লকডাউন না, এটা এক ধরণের মশকরা!

আসলে কোন পথে এগোবে সরকার? যখন অফিস বন্ধ করতে বলা হলো, সাধারণ মানুষের পেটে পাথর বাঁধার উপক্রম! করোনায় না মরলে না খেয়ে মরতে হবে। গণপরিবহন বন্ধ কিন্তু অফিস খোলা, এটা আসলে কেমন আইন সেটাও বোধগম্যতার বাইরে। গণপরিবহনে ৬০% ভাড়া বৃদ্ধি কিন্তু নেয়া হচ্ছে দ্বিগুণ! প্রশাসন এক্ষেত্রে নীরব। গার্মেন্টস বন্ধ করলে থমকে যাবে হাজার পরিবারের ভরণ পোষণ! শপিংমল-দোকানপাট বন্ধ করলেও সমস্যা, না করলেও সমস্যা! এক বছর লোকসান গুণে এ বছর দোকান মালিকদের পথে বসার অবস্থা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, বারবার বলেও খোলার কোনো অবকাশ নেই। থেমে আছে হাজারো স্নাতক-স্নাতকোত্তর পরীক্ষা, মারাত্মক হুমকির মুখে ঝুলে আছে সব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ!

ধর্মীয় উপাসনালয়ে উপাসনার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ, জনগণ বলছে করোনা কী শুধু উপাসনালয়েই আসে? যৌক্তিক প্রশ্ন, ধর্মপ্রাণ মানুষদের অন্তরে আঘাতই বটে। কিন্তু যার হারায় সে-ই বোঝে এটা কতটা বিভৎস আর যন্ত্রণাদায়ক। এক্ষেত্রেও সরকার উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে, হয় একেবারে বন্ধ রাখা হোক নাহয় পরিপূর্ণভাবে খুলে দেয়া হোক। যদি সমস্যা হয় তার দায় সরকার নেবে না এই মর্মে বলা হোক। কিন্তু না, সরকার সকলের দাবী রাখতে গিয়ে চরম আস্থাহীনতার পরিচয় দিচ্ছে। এক্ষেত্রে মূল দোষ গদিতে বসে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্ত(!) কর্তাদের। কোনোরকমের পরামর্শ বা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছাড়াই হুট করে আইন প্রণয়ন বা বাধানিষেধ আরোপ করা হচ্ছে যা জনগণকেই পীড়া দিচ্ছে।

হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নেই, অক্সিজেন সরবরাহ নেই, ঘণ্টায় ৩ জন করে মানুষ মারা যাচ্ছে বাংলাদেশে। ২০০০ শয্যার হাসপাতাল আলিফ লায়লার জ্বিনের মত উধাও, ভ্যাকসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সেই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে স্বচ্ছ বক্তব্য নেই, সব মিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ।

হ্যান্ড সেনিটাইজার

এক হাতে যেমন তালি বাজে না তেমনই সরকারের দূরদর্শীতা আর জনগণের সচেতনতা ছাড়া কোনোভাবেই কোভিড মোকাবিলা করা সম্ভব না। শুধু মানুষের কর্মসংস্থান বন্ধ করলেই চলবে না, ভাবতে হবে সেসব মানুষকে কীভাবে চালাতে হবে। কীভাবে এই অতিমারীকে সাময়িক রোগ হিসেবে মাথায় রেখে সচেতনতার সাথে এগিয়ে যেতে হবে, গণজমায়েত বন্ধ করে পরিপূর্ণ বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। সকল প্রকার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সহ সব রকমের পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ করতে হবে। অর্থনৈতিক প্রণোদনা সহ নানান পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে যাতে দুর্ভিক্ষ শুরু না হয়!

এক দুর্যোগ আরো অনেক দুর্যোগের পূর্ভাবাস দেয়, সেটা হোক রাজনৈতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক৷ সবচাইতে প্রয়োজনীয় বিষয় হলো সচেতনতা। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি বাংলাদেশে এর লেশমাত্র নেই! তাও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।