সবে গিয়েছে ডুবে পূর্ণিমার চাঁদ মরিবার হ’লো তার সাধ

0

মাইকেল কলিন্স! ইতিহাসের সবচেয়ে দূর দ্রাঘিমাংশের একাকী মানুষ! সভ্যতার ইতিহাসে তিনিই প্রথম মানুষ, যিনি মনুষ্য সমাজ থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী (চাঁদের কক্ষপথ) স্থানে বন্ধুহীন একাকী নিঃসঙ্গ ছিলেন টানা আট দিন।

যদিও তাঁকে চন্দ্রাভিযানের একজন বলা হয় কিন্তু তিনি চাঁদের মাটি স্পর্শ করেননি। তিনি ছিলেন অভিযাত্রিক। কমান্ড মডিউল পাইলট হিসেবে তিনি চাঁদের কক্ষপথে ‘কলম্বিয়া’ চন্দ্রযানের মধ্যেই একাকী ছিলেন।

১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই (যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময়) পৃথিবীর জন্য ঐতিহাসিক সেই ক্ষণ কিন্তু ঘটনাস্থল পৃথিবী থেকে ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার দূরে। সেদিন আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন চাঁদে নামলেও কলিন্সের নামা হয়নি। বলা হয়, চাঁদের মাটিতে পা রেখে তাঁরা বদলে দিয়েছিলেন মানবসভ্যতার ইতিহাস। আনন্দবাজার পত্রিকা পরদিন ব্যানার লিড নিউজ করে মাত্র একটি শব্দে ‘চন্দ্রপদতলে’!

পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণ এবং ফের পৃথিবীতে অবতরণ— এই মিশনটা সম্পূর্ণ হতে মোট সময় লেগেছিল ৮ দিন ৩ ঘণ্টা এবং ১৮ মিনিট।
৫০ বছর হয়ে গেলো সেই অভিযানের। সেদিন অজানা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় চাঁদে হেঁটেছিলেন নাসার ‘অ্যাপোলো-১১’ অভিযানের দুই মহাকাশচারী নিল আর্মস্ট্রং ও এডুইন (বাজ) অলড্রিন।

কিন্তু একাকী নভোচারী কলিন্সের কেমন লেগেছিলো পুরো সময়টা? একা একা নভোযানে বসে চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে চলেছিলেন মহাকাশচারী মাইকেল কলিন্স।

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা ‘জন অরণ্য’তে বেকার চাকরিপ্রার্থী নায়ক সোমনাথ চরিত্রে প্রদীপ মুখোপাধ্যায়কে চাকরির ইন্টারভিউতে প্রশ্ন করা হয়েছিলো “চাঁদের ওজন কত?” সহজ সরল সোমনাথ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে বসল, “এর সাথে চাকরির কী সম্পর্ক?” এটা শুনেই প্রশ্নকর্তারা তাকে ইন্টারভিউ বোর্ড থেকেই বের করে দেয়। ‘সীমাবদ্ধ’ সিনেমার চাকরিপ্রার্থী নায়ক বেকার।

চরিত্রে ধৃতিমান চ্যাটার্জিকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, ষাটের দশকের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কোনটি? ভিয়েতনামের যুদ্ধ নাকি চন্দ্রজয়? সোমনাথ খুব স্মার্টলি উত্তর দেয় ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং তার উত্তরর সপক্ষে যুক্তিও দেন। কিন্তু কর্পোরেট অফিসার বা সাক্ষাৎকারগ্রহতারা তাতে সন্তুষ্ট হয়না। রেগেগিয়ে ভাইবা বোর্ড ছেড়ে বেড়িয়ে আসেন শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জি।

কলিন্সের মৃত্যুর খবরে অভিনব শিরোনাম দিয়েছে BBC online, সংবাদ সংস্থাটি লিখেছে Unsung hero of the first Moon landing আনসাং হিরো বলতে বোঝানো হয় নেপথ্যের নায়ককে, জনসাধারণ যার বন্দনা গায় না। যেমন: পত্রিকার সহ সম্পাদক। কলিন্স যেহেতু চাঁদে গিয়েও চাঁদে নামতে পারেননি, তাই তাঁর বীরগাঁথা বাকি দুই অভিযাত্রিক থেকে কিছুটা কম প্রচারণায়।

বিবিসি প্রতিবেদন

 

সংবাদ সংস্থা CNN অনলাইন পাঠককে সিক্ত করেছে, স্মৃতিকাতর করেছে এই বলে যে, Collins was often called “the loneliest man” once he returned to Earth, but he didn’t feel that way — even when he lost contact with Mission Control during his flybys on the far side of the moon. আরেকটু এগিয়ে গিয়ে কলিন্সের মৃত্যু সংবাদে লিখা হয়েছে “It was a happy home. I liked Columbia” এটি একাকী মহাকাশচারী কলিন্সের নভোযানকেই ঘর ভাবার প্রতীকী তাৎপর্য।

ব্রিটিশ প্রভাবশালী দৈনিক দি গার্ডিয়ানের অনলাইন এডিশনের খবরে লিখেছে “It was because of this part of the mission that some dubbed him the loneliest man in humanity”

পৃথিবী থেকে দূরে চাঁদের কক্ষপথের একাকীত্ব নিয়ে CBC অনলাইনে লিখেছে, Often described as the “forgotten” third astronaut on the historic mission, Collins remained alone for more than 21 hours until his two colleagues returned in the lunar module.

পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদ। প্রতি পূর্ণিমায় আমাদের চোখ যায় ভরা জোছনায়। যারা আমাদের চাঁদকে চেনালো তাঁদের একজন আজ পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেলেন। যার ছিলো দারুণ এক নিঃসঙ্গ অভিজ্ঞতা।

দুদিন হলো না চাঁদনী রাতের। ছিলো বাংলা বছরের প্রথম পূর্ণিমা। আর কে জানতো এই পূর্ণিমার রেশ না কাটতেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিবেন চন্দ্রজয়ী মহাকাশ নায়ক মাইকেল কলিন্স!

চাঁদের এই রকম ক্ষয় ও বৃদ্ধির চক্রাকারে গত পরশুর পূর্ণিমা কাটিয়ে কোন ঘন অমানিশা অপেক্ষা করছে, সেটা প্রকৃতিই জানে। চাঁদ পৃথিবীর চারিদিকে প্রায় গোলাকার পথে ঘুরে বেড়ায়। ক্লান্তিহীন সে ঘুরছে। আজ থেকে কলিন্স তাঁর নতুন ভ্রমণ শুরু করলো। পূর্ণিমা সন্ধ্যার রজনীগন্ধ্যায় আকাশ ভরা চাঁদের হাসি বাঁধভাঙ্গা আলো কলিন্সের মত আমাদের পথ দেখাবে।

কবিগুরু লিখেছেন, ‘যৌবনসমুদ্রমাঝে কোন্‌ পূর্ণিমায় আজি এসেছে জোয়ার’!

আজকের এই করোনাক্রান্তিতে গানটির প্রাসঙ্গিকতা এতটাই প্রবল যে, যেখানে রবি-বুড়ো বলছেন, ‘এ মোর নির্জন তীরে কী খেলা তোমার’! হ্যাঁ, আসলেই তো! সমগ্র ভূ-চরাচর আজ মাথার ওপর ভয়াবহ একটি চাঁদকে নির্জন করে রেখেছে কলিন্স। সেই রবিবুড়োর পর নজরুলকে বলতে শুনি- ‘চাঁদনী রাতে.. মনের আঁধার কেন গেল না’।

কলিন্সের শেষ বিদায়ে শুধু মনে বাজছে কিছু কথা। কাকলির গান যদি আবার বাজে, ভ্রমরের পাখনায় যদি ক্লান্তি শেষ হয়, যদি অশান্ত দুর্বার ঘূর্ণি হাওয়া থামে, যদি পৃথিবীর জ্বর শেষ হয়; তবে মাথার ওপর এরকম ভরা পূর্ণিমার চাঁদকে সাক্ষী রেখেই গৌতম বুদ্ধের মতো গৃহত্যাগী হবো আমরা, মাইকেল কলিন্স!

একটা মৌলিক একাকিত্ব মানুষ মাত্রেরই থাকে। কবি আবুল হাসান যেমন লিখেছিলেন, ‘মানুষ তার চিবুকের কাছেও একা।’ কলিন্স সেদিন একা একা মহাকাশে নভোযানের গতি ও মতি ঠিকঠাক না রাখলে পরিণতি খুব সুখকর হতো না। লেখক কমলকুমার মজুমদার বলেছিলেন, ‘আমরা এখন সব আল দেয়া জমির মত একা।’ যে কলিন্স দুই সহযাত্রীর সফলতায় নিজেকে কিছুটা স্বেচ্ছায় আড়াল রেখে অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ দায় সেরেছেন, তিনি আজ সত্যি সত্যি কফিনবন্দী একাকী! মানুষ নাকি আসে একা যায় একা। কলিন্স একধাপ বেশি। কলিন্স ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন চন্দ্র বিজয়ের দিন একা মানুষ!

বিদায়, পৃথিবীর প্রথম একাকী মানব। বিদায় মাইকেল কলিন্স!

অতিথি লেখক: রাজীব নন্দী
শিক্ষক, লেখক ও গবেষক