উখিয়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধার ঘর ভাঙচুর, পুড়িয়ে মারার হুমকি!

0

কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলায় একজন বীর মুক্তিযুদ্ধার ঘর ভাঙচুর করে তাঁকে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে মারার হুমকি দিয়েছে দখলবাজ সন্ত্রীসারা। বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মুক্তিযোদ্ধা উখিয়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন।

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেস। তরুণ বয়সে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় সম্মুখ যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলো একাত্তরের সংকটে। এখন বৃদ্ধ বয়সে নিজের ঘর বাড়ি রক্ষা করতে পারছেন না।

৬ জুন সকালে এলাকার প্রভাবশালী সন্ত্রাসী ও দখলবাজরা উখিয়া মরিচ্যা মৌজার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেমের নিজস্ব জমিতে গড়ে তোলা বাড়িতে ভাঙচুর করে। ঘরের ভিতর থাকা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পত্র লুট করে নিয়ে যেতে চায়। এই সময় মুক্তিযোদ্ধা কাশেম বাঁধা দিলে হামলাকারিরা তাকে খুন, গুম, অঙ্গহানি সহ মেরে ফেলার প্রকাশ্য হুমকি প্রদান করে।

শুধু তাই নয়, ঘরবাড়ি সহ তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারার হুমকি দেয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেমের ঘর ও জমি দখল করার লক্ষ্যে পরিকল্পনা করে ৬ জুন এই হামলা করে সন্ত্রাসীরা।

এই ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা বাদী হয়ে হলদিয়া পালং এর পশ্চিম মরিচ্যার মৃত জয়নাল আবেদিনের পুত্র বেলাল (৩৫) এবং মোজাহের ( ৪০) সহ অজ্ঞাত ৫/৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম, সেই সময় পাকিস্তান সরকার তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করেন, কিন্তু তিনি পালিয়ে না গিয়ে তখন সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হন। তিনি ক্যাপ্টেন ছোবহান নেতৃত্বে যুদ্ধে নেমে পড়ে, একের পর এক অপারেশন চালাতে থাকে। এর মধ্যে ক্যাপ্টেন ছোবহান দুজনকে দায়িত্ব দেন। এই দুজন হচ্ছেন কাশেম ও নির্মল কান্তি দাস।

তারা ছদ্মবেশে উখিয়ায় দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় ক্যাপ্টেন ছোবহান তাদের বলেন, সাবধান মানুষের সাথে মিলেমিশে শত্রুদের অবস্থান। গতি বিধি ইত্যাদি লক্ষ করে এক সপ্তাহের মধ্যে আমাকে রিপোর্ট প্রদান করবে।

সেদিন ছিল উখিয়ার সাপ্তাহিক হাট বাজার, বাজারে প্রচুর মানুষ। কিন্তু এত মানুষের ভিড়েও দালাল বাহিনী তাঁদের চিনে ফেলে। ২০ জনের একটি বাহিনী এসে ধুরুং খালী থেকে আবুল কাশেম ও নির্মলকে ধরে ফেলে। কৌশলে পালিয়ে আবুল কাশেম পানিতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কেটে জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়। নির্মলও স্থানীয় নাপিত পাড়ার একটি বাসায় লুকিয়ে থাকে, তখন রাজাকার বাহিনী ঘর জ্বালিয়ে দেয় এবং ঘরে গুলি করে। একসময় এসব নরপশুদের হাতে ধরা পড়ে যায় নির্মল, তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় ভুট্টো মহাজন সহ বেশ কয়েকজন মুক্তিকামী মানুষকে ধরে নিয়ে গিয়ে অসহ্য নির্যাতনের পর টেকনাফের পাহাড়ের চূড়ায় তাদেরকে হত্যা করা হয়।

সেই সময় আবুল কাশেম নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে যান। তখন সহযোদ্ধারা ভাবল মৃত্যু থেকে বেঁচে যাওয়া আবুল কাশেম হয়তো আর যুদ্ধে অংশ নেবে না, পালিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে কিন্তু তাদের ভাবনা কে হার মানিয়ে তিনি পরের দিন ক্যাম্পে ফিরে এলেন।

প্রথম ধাক্কায় মৃত্যু ভয় তরুণ কাসেমকে কাবু করতে পরেনি, এরপর দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অকুতোভয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধা পরবর্তীতে একের পর এক অপারেশনে অংশ নেন।

ক্যাপ্টেন আবদুস ছোবহানের নেতৃত্বে গেরিলা পদ্ধতিতে শুরু হয় অভিযান, আবুল কাশেম ও গেরিলা অভিযানে অংশ নেয়। জোয়ারিয়ানালা লালব্রীজ অপারেশন, ঈদগাঁ ব্রীজ অপারেশন, টেকনাফ থানা অপারেশন, লামা থানা অপারেশন, ডুলাহাজারা সেতু অপারেশন, রামু থানা অপারেশন, উখিয়া থানা আপারেশন, কুতুবদিয়া থানা বিজয়, পালং বহুমুখী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্প স্থাপন সহ ১১ টি অপারেশনে অংশ নেন আবুল কাশেম।

এসব অপারেশনে অংশ নেন শমশের আলম চৌধুরী, এডভোকেট আহমদ হোসেন, মোক্তার আহমেদ, জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বখতার আহম্মদ চৌধুরীসহ আরো মুক্তিযোদ্ধা।

উখিয়া-টেকনাফে বিভিন্ন স্থান থেকে শত্রুপক্ষের ৬ জনকে আটক করা হয় এর মধ্যে দুজন পালিয়ে গেলেও। পানেরছড়া ঢালায় (বর্তমান সেনানিবাসের গেট) চারজনকে হত্যা করে আবুল কাশেম সহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা। সর্বশেষ কক্সবাজার শহর শত্রুমুক্ত করা অভিযান ও প্রথম পতাকা উত্তোলনে অংশ নেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আবুল কাশেম ছিলেন এক নম্বর সেক্টরের ৭৯৩৯ রেজিমেন্টালের কমান্ডার ক্যাপ্টেন আবদুস ছোবহান গ্রুপের ৪ নং প্লাটুনের ১২ নং সেকশন কমান্ডারের টুআইসি ছাত্র।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেমের ঘর ভাঙচুর করা আর হত্যার হুমকি দেওয়া জাতির জন্য দুঃখজনক ও লজ্জাজনক। মুক্তিযোদ্ধার বিভিন্ন সংগঠনসহ সচেতন মহল এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায় এবং হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।