ঈদুল আজহাঃ ত্যাগের উৎসব, অহংবোধ পতনের উৎসব

বিশেষ প্রতিবেদন

0

ঈদুল আজহা একটি আরবি শব্দ যার অর্থ ত্যাগের উৎসব। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসবসমূহের মধ্যে ঈদুল আজহা অন্যতম। এটি কুরবানীর ঈদ হিসেবেও পরিচিত।

ইসলামে কুরবানীর ইতিহাস বেশ প্রাচীন। হাবিল আর কাবিলের কোরবানীর কথা কুরআনে উল্লেখ রয়েছে। স্রষ্টার উদ্দেশ্যে হাবিল একটা প্রাণী আর কাবিল তার ফসলের কিছু অংশ নিবেদন করে। আকাশ থেকে আগুন নেমে আসে এবং গ্রহণযোগ্য কোরবানী গ্রহণ করবে এটাই ছিল আল্লাহর নির্ধারিত পদ্ধতি। আগুন নেমে এসে হাবিলের কোরবানী গ্রহণ করে এবং কাবিলের কোরবানী প্রত্যাখ্যান করে।

তবে মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর ১০ই জিলহজ্ব ‌যে কোরবানী দিয়ে থাকেন এটার প্রচলন আসছে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম থেকে। আল্লাহ তা’আলা হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এর উপর পরীক্ষা স্বরূপ নিজের প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামকে কুরবানীর নির্দেশ দেন। তিনিও মহান আল্লাহর নির্দেশে নিজ পুত্রের ইচ্ছায় সন্তানকে জবেহ তথা কুরবানী করার জন্য শুইয়ে দিয়েছেন।
মহান আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো পিতা পুত্র দুইজনেই।

মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এর কোরবানীর পর থেকে মুসলিম উম্মাহ আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে তার নির্দেশে কোরবানীর বিধান পালন করে আসছেন।

ইসলামী শরীয়তের অন্যতম নিদর্শন কুরবানী। এটি একটি আর্থিক ইবাদত। নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পশু আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাওয়াবের নিয়্যতে জবেহ করার নামই কোরবানী।

জিলহজ মাসের ১০থেকে ১২ তারিখের ভেতরে কোন প্রাপ্ত বয়স্ক সুস্থ মস্তিষ্কের নর-নারী যদি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক(প্রয়োজন ব্যতিরেকে) হয় তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। মুসাফিরের জন্য কুরবানী ওয়াজিব নয় তবে নফল হিসেবে করতে পারে, সাওয়াব পাবে।

১০ জিলহজের সুবহে সাদিক থেকে ১২ জিলহজের সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানীর সময় সীমা। সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে ১০ তারিখ। অপারগতায় ১১ কিংবা ১২ তারিখও করা যাবে।

কুরবানী কেমন পশু দিয়ে করতে হবে তা ইসলামী শরীয়তে নির্ধারণ করে দিয়েছে। আর সেগুলো হলো- উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা।

উট পাঁচ বছর, গরু ও মহিষ দুই বছর , ভেড়া-ছাগল এক বছর বা এর বেশি হতে হবে। এর চেয়ে কম বয়সের না জায়েজ। তবে দুম্বা বা ভেড়া ছয় মাসের বাচ্চা যদি এতটুকু বড় হয় যে, এক বছর বয়সের মনে হয় তাহলে সেটার দ্বারা কোরবানী জায়েজ।

কোরবানীর পশু দোষ ত্রুটিমুক্ত হওয়া চাই। যৎসামান্য ত্রুটি থাকলে কোরবানী হয়ে যাবে , তবে মাকরুহ হবে। আর যদি দোষ ত্রুটি বড় আকারের হয় তাহলে কোরবানী হবেই না। অন্ধ, কানা খোঁড়া, কানকাটা, লেজকাটা, দাতঁহীন, ঠোঁট কাটা, নাক কাটা, জন্মগত কানবিহীন ইত্যাদি দোষযুক্ত পশু দ্বারা কোরবানী জায়েজ নেই। তাই ক্রেতাকে পশু কেনার সময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

অনেকেই অংশীদারি তথা ভাগে কোরবানী করে সেক্ষেত্রে মাংস যেন ওজন করে ভাগ করা হয়। আন্দাজ করে যেন বন্টন না করা হয়। কারণ যদি কারো কাছে বেশি যায়। অন্যজন মাফ করে দিলেও জায়েজ হবে না। কারণ সেটা শরীয়তের হক্ব।

কোরবানীর পশুর চামড়া দিয়ে জায়নামাজ কিংবা বিছানা বানানো কিংবা যেকোন কাজে লাগানো যাবে কিন্তু বিক্রি করলে এর মূল্য কাজে লাগানো যাবে না। তখন এর মূল্য সদ্বকা করা ওয়াজিব।

উট, গরু ও মহিষ দিয়ে কোরবানী করলে নফল হিসাবে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে এক ভাগ কোরবানী দেওয়া অতি উত্তম। শরীকদারী কোরবানীতে এক বা একাধিক অংশ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে কোরবানী দিতে পারবে। মহানবী হায়াতে জিন্দেগীতে উম্মতের পক্ষ থেকে কোরবানী করেছেন‌।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে লোক দেখানোর জন্য কুরবানী নয় বরং পশুকে জবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে মনের পশু ও আমিত্বকে জবাই করার তাওফীক দান করুন। কুরবানীর মাধ্যমে নিজেকে তাকওয়াবান হিসেবে তৈরি করার তাওফীক দান করুন।

 

লেখক: এমডি মাসুদ

যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়