উখিয়া-টেকনাফে দুই বছরে ৭টি হাতির মৃত্যু

0

উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে নষ্ট হয় হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর। এরপর তৈরি হয় হাতি ও মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব। পাহাড় থেকে খাবারের খোঁজে লোকালয়ে এসে একের পর এক মারা পড়ছে বুনো হাতি। মৃত্যুর এই মিছিল যেন থামছেই না।

কক্সবাজারে গেল ২ বছরে প্রাণ দিতে হয়েছে ৭টিরও বেশি বন্যহাতিকে। সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বুনো হাতির মৃত্যুর তালিকা আরো দীর্ঘ হতে পারে বলে মনে করছেন পরিবেশ সচেতন কর্তাব্যক্তিরা। পাহাড়ি জনপদে বিচরণকারী হাতির সুরক্ষায় অভয়াশ্রম গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনাঞ্চল উজাড় হওয়ায় বুনো হাতির খাবারের উৎস দিন দিন কমছে। এ ছাড়া বনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনে শিকার উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নিয়েছে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গার আশ্রয় দিতে গিয়ে উজাড় হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ৮ হাজার একরেরও বেশি বনভূমি।

যার কারণে খাবার খুঁজতে খুঁজতে পাহাড় ছেড়ে লোকালয়ে নেমে এসে মানুষের বাধার মুখে পড়ে হাতির দল। বাধা পেয়েই তারা ফসলের মাঠ, মানুষের বসতঘরে তাণ্ডব চালায়। একপর্যায়ে হাতির দল বুনো আচরণ শুরু করে। কোনো কোনো সময় পায়ে পিষ্ট করে, কখনো শুঁড় পেঁচিয়ে তুলে আছাড় দিয়ে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। এই প্রেক্ষাপটে টিকে থাকার লড়াইয়ে নিজেদের জান-মাল রক্ষায় বুনো হাতির ওপর হিংস্র হয়ে ওঠে মানুষ।

অপরদিকে ধ্বংস হয়েছে বন, পাহাড়, গাছপালা ও প্রাণ প্রকৃতি। হুমকির মুখে পড়েছে সেখানকার নানা প্রজাতির পশুপাখির সঙ্গে বন্যহাতিরাও।

তবে বনবিভাগ বলছে, হাতির নিরাপদ আবাসস্থল, খাদ্য ও করিডোর তৈরিতে কাজ করছে বনবিভাগ। যার কারণে গেল ২ বছরে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বনাঞ্চলে দেখা মিলেছে ২০টির অধিক বন্য হাতির বাচ্চা। ইতোমধ্যে প্রায় ৭৪০ একর পাহাড়ি বনভূমিতে হাতির জন্য করা হয়েছে নিরাপদ আবাসস্থল, খাদ্য ও করিডোর উন্নয়ন।

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, কক্সবাজার টেকনাফ পর্যন্ত ৬৩টি এশিয়ান হাতি রয়েছে। অধিকাংশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে এসব হাতির আবাসস্থলে। ফলে এসব হাতির জীবন হুমকির মুখে পড়ে। তাদের চলাচলের করিডোরও বন্ধ হয়ে যায়।

দীপক শর্মা দীপু বলেন, ‘২০১৭ সালে রোহিঙ্গা আসার পর থেকে খাদ্য, আবাসস্থলসহ নানাভাবে বিপদে পড়ে কক্সবাজার বনাঞ্চলের হাতি। এর মধ্যে বনাঞ্চলে বাচ্চা হাতির দেখা যাওয়া ও হাতির বাচ্চা প্রসব করার খবরগুলো অত্যন্ত আনন্দদায়ক। তাই এই অবস্থায় হাতিদের যে আবাসস্থল রয়েছে তা নিরাপদ রাখতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তাসহ নানাভাবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তবে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে নষ্ট হয়েছে উখিয়া ও টেকনাফের হাতির নিরাপদ আবাসস্থল, খাদ্য ও করিডোর। যার কারণে খাবারের খোঁজে হাতি লোকালয়ে এসে বার বার আক্রমণ করে। ফলে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা আসার পর থেকে এ পর্যন্ত ৭টি হাতি মারা যায়। যার মধ্যে একটি হাতির বাচ্চা ছিল। কিভাবে হাতির নিরাপদ আবাসস্থল, খাদ্য ও করিডোর উন্নয়ন করা যায় সে বিষয় নিয়ে ২০১৮ সালের শেষের দিকে কাজ শুরু করে বনবিভাগ।

বলা যায়, গেল দু’বছরে হিমছড়ি, ধোয়াপালং, পানের ছড়া, ইনানী, হোয়াইক্যং, শীলখালী রেঞ্জের বনাঞ্চলে এসব হাতির বাচ্চা জন্ম নিয়েছে। প্রতিনিয়ত বনাঞ্চলের দায়িত্বরত রেঞ্জ ও বিট কর্মকর্তা এবং সিপিজি সদস্যরা বন্যহাতি ও বাচ্চা হাতির প্রতি নজর রাখছে।

তিনি বলেন, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭৪০ একর পাহাড়ি বনভূমিতে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। মো. হুমায়ুন করিব আরও জানান, বনবিভাগ চেষ্টা করছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে হাতির একটি নিরাপদ আবাসস্থল, খাদ্য ও করিডোর তৈরি করতে। যাতে বন্যহাতি গুলোকে নিরাপদ রাখা যায়।