টুঙ্গিপাড়ার ছোট্ট খোকা থেকে বাঙালি জাতির পিতা

0

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ একটি মহাকাব্য। আর এ মহাকাব্যের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

কে জানতো ১৯২০ সালের ১৭ ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেয়া সে ছোট খোকা নামের ছেলেটিই যে হয়ে উঠবে বঙ্গের বন্ধু, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক কবি, ও বাঙ্গালি জাতির জনক।

যিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি, এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৮ বছর বয়সে ১৯৫৮ সালে বেগম ফজিলাতুন্নেসার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন শেখ মুজিব।

তিনি ১৯৩৯ সালে প্রথম বারের মত কারাবরণ করেন।  ১৯৪৪ সালে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগদান করেন। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি রাজনীতিতে অভিষিক্ত হন।

১৯৪৬ সালে বঙ্গবন্ধু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কলকাতা ইসলামি কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে বঙ্গবন্ধু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। দেশ ভাগের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে ভর্তি হন।

চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি-দাওয়ার প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনে উস্কানি দেয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে বহিষ্কার করে। ১৯৫২ সালের ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে বঙ্গবন্ধু কারাগারে অনশন শুরু করেন।

 

বাবা-মায়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (ছবি -মুজিব ১০০)

১৩ দিনের টানা অনশনে বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যের অবনতি হলে ২৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তিদেয়া হয়। ১৯৫৩ সালেপ্রাদেশিক আওয়ামী মুসলীম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভায় বয়:কনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নামকরণ করা হয় আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু পুনরায় দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ হিসেবে খ্যাত ছয় দফা উত্থাপন করেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামী করে মোট ৩৫জন বাঙ্গালী সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিছিন্ন করার অভিযোগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। ১৯৬৯ এর ২২ ফ্রেব্রুয়ারি তীব্র গণআন্দোলনের মুখে সরকার রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য শিরোনামে মিথ্যা মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়।

অবিস্মরণীয় গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমান। (ছবি-মুজিব ১০০)

 

১৯৬৯ সালের ২৩ ফ্রেব্রুয়ারি ডাকসু এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে এক বিশাল সম্বর্ধনা দেয়ার আয়োজন করে। ঐ সভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৯৭০ সালের দ্বিবার্ষিকী কাউন্সিলে আওয়ামী লীগ একক দল হিসেবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়

১৯৭০ সালের আওয়ামী লীগের বিপুল ব্যবধানে জয় লাভ করলেও পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে দেয়। ১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ বঙ্গবন্ধু তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক যুগান্তকারী ভাষনে ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষনে ষ্পষ্ট হয়ে যায় স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যত। সারাদেশে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব অসযোগ আন্দোলন।

১৯৭১ এর ২৫ ই মার্চ নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চলে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর অপারেশন সার্চ লাইট। এবং গ্রেফতার করা হয় মুজিবকে। গ্রেফতারের পূর্বে ওয়ারলেস যোগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন শেখ মুজিব। ১৯৭১ সালের ১৭ ই এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি বানিয়ে তৎকালীন মেহেরপুর গ্রামে বাংলাদেশ সরকারের নতুন মন্ত্রি পরিষদ ঘোষণা করা হয়।

৩০ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে ১৬ ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল লন্ডন ও দিল্লী হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন পাকিস্তানে বন্দী থাকা শেখ মুজিব।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডনের ক্লেরিজেস হোটেলের প্রেস কনফারেন্সে বিশ্ব মিডিয়ার মুখোমুখি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। (ছবি – মুজিব ১০০)

১৯৭৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বাঙালী নেতা হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিণষষদে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেন।১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট একদল বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তার হাতে সপরিবারে নিহত হন হাজার বছরের এই শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

২০০৪ সালে বিবিসি কর্তৃক পরিচালিত জনমত জরিপে শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে নির্বাচিত হন।

২০১৭ সালের ৩০ শে অক্টোবর ইউনেস্কো ৭ ই মার্চের ভাষণকে  ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।